শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি:
বনের ভেতরেই ছিল তাদের জীবন। গাছের ছায়া, ঝোপঝাড় আর নির্জন প্রকৃতির বুকেই ছিল নিরাপদ আশ্রয়। খাবারের জন্য ছিল বনজ ফল, পোকামাকড় কিংবা অন্য প্রাণী। কিন্তু সেই চেনা জগৎ এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। কমছে বন, সংকুচিত হচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল, কমছে খাবারের উৎস। ফলে খাবার ও আশ্রয়ের সন্ধানে বনের প্রাণীদের অনেককেই এখন চলে আসতে হচ্ছে মানুষের বসতিতে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গত আগস্ট মাসে লোকালয় থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। ১ থেকে ৩১ আগস্ট উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে অজগর, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, শঙ্খচিল, তক্ষক, শঙ্খিনী, দাঁড়াশ, বেত আঁচড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর কয়েকটি ছিল আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। উদ্ধারের পর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা করা হয়। সুস্থ হয়ে ওঠার পর বন বিভাগের সহায়তায় এসব প্রাণীকে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, আগস্ট মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব বিভিন্ন সময়ে মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও হাইল হাওর এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করেন।
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি বেত আঁচড়া উদ্ধার করা হয়।
৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধার করা হয়। ১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল এবং ১৩ আগস্ট ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
১৫ আগস্ট রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়। ১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়।
২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে একটি সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। এরপর ২৮, ২৯ ও ৩০ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, সাতগাঁও-খিলগাঁও ও ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
পরিবেশকর্মীদের মতে, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর আনাগোনার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসা। একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল ছিল নানা প্রজাতির প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি ও নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠায় অনেক জায়গায় বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে খাবারের উৎসও।
পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। বন ও পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে একদিন এসব প্রাণীও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী উদ্ধার শুধু প্রাণ বাঁচানোর কাজ নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



















