সোহানুর রহমান, রাজনগর:
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকার যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করে, তা যখন জনপ্রতিনিধিদের পকেটে যায়, তখন তাকে আর ‘অনিয়ম’ বলা চলে না, তা সরাসরি ‘লুটতরাজ’। মৌলভীবাজারের ৫নং রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদে ঠিক এমন এক নজিরবিহীন চুরির ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি নথিতে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ মেট্রিক টন চাল আজ সাধারণের মুখে না গিয়ে পৌঁছে গেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের গুদামে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মাধ্যমে প্রাপ্ত খবরের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জানা গেছে, ৫নং রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই বিশাল পরিমাণ চাল লোপাট করেছেন। দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত এই চাল ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সুষম বণ্টনের কথা থাকলেও, চেয়ারম্যান তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে তা স্থানীয় কয়েকজন অসাধু চাল ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে, অন্যদিকে কয়েক হাজার মানুষ তাদের প্রাপ্য খাদ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এই দুর্নীতির মূলে রয়েছেন চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় প্রভাবশালী বলয়। যারা এই চাল গুদামজাত করা এবং গোপনে পাচারের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে এবং কখনও কখনও দিনের আলোতেই তড়িঘড়ি করে চালের বস্তাগুলো নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই লুটতরাজ কেবল চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তে সম্ভব হয়নি; বরং এর পেছনে রয়েছে এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনগর ইউনিয়নের উন্নয়ন ও ত্রাণের বরাদ্দ নিজেদের পকেটে তুলছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যখনই এই ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হয় বা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে, তখনই তাঁদের ওপর নেমে আসে রাজনৈতিক খড়গ। এই এলাকায় সত্য প্রকাশের মূল্য দিতে হয় চাঁদাবাজি, হুমকি এবং শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়ে। জনস্বার্থে বরাদ্দ করা সম্পদ যখন কতিপয় ব্যক্তির বিলাসের উপাদানে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সরকারি সম্পদের এই প্রকাশ্য লুটতরাজ মূলত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সমান।
রাজনগর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ আজ ক্ষুধার্ত, অথচ তাঁদের জন্য আসা চাল বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে। এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের নায়ক জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সঠিক তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই ‘লুটতরাজ’ বন্ধ করা সম্ভব। অন্যথায়, ‘দিনের আলোতে’ এই চুরির সংস্কৃতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কোনো শেষ থাকবে না।



















