সোহানুর রহমান:
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতির যে চর্চা আমরা দেখছি, তা জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতার দম্ভ এবং দুর্নীতির এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো সচেতন নাগরিক বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদক প্রান্তিক পর্যায়ের সুসংগঠিত অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র জনসমক্ষে নিয়ে আসেন, তখনই তাঁর ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। সত্য উন্মোচন করা আজ এই সমাজে কেবল কঠিনই নয়, বরং জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে রাজনীতির এক কুৎসিত চেহারা উন্মোচিত হয়। যখন শীতের তীব্রতায় কাঁপতে থাকা অভাবী মানুষের জন্য আসা সরকারি কম্বল বা ত্রাণসামগ্রী প্রকৃত দুস্থদের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়, তখন তা কেবল দুর্নীতি থাকে না, বরং তা মানবতাবিরোধী অপরাধে রূপ নেয়। এই ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে বা প্রতিবেদন প্রকাশ করলে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে একদল সুবিধাবাদী ক্যাডার বাহিনী প্রতিবাদকারীর কণ্ঠরোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে শারীরিক আক্রমণ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই তারা দ্বিধা করে না। এই পেশিশক্তির আস্ফালনই আজ আমাদের তথাকথিত ‘পবিত্র’ রাজনীতির অলিখিত দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রহস্যজনক নির্লিপ্ততা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যখন কোনো ব্যক্তি সত্য প্রকাশ করার কারণে হুমকির মুখে পড়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন, তখন রাষ্ট্র তাঁকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই উল্টো নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ইশারায় পুলিশ অভিযোগ নিতে গড়িমসি করে অথবা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। যখন রক্ষকই ভক্ষকের অনুকূলে অবস্থান নেয় কিংবা ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ বন্ধ করে রাখে, তখন সমাজে বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি গেড়ে বসে। ক্ষমতার এই বলয়ে থেকে প্রশাসন আজ জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষায় বেশি সচেষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়।
আমাদের রাজনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নামধারী দুর্বৃত্তদের মধ্যে এক ধরণের অঘোষিত মৈত্রীবন্ধন তৈরি হয়েছে। এই সিন্ডিকেট রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে। যারা জনস্বার্থে এই অনিয়মের শিকড় উপড়ে ফেলতে চান, তাঁদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার বা নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। রাজনীতির এই বিরাজনীতিকীকরণ ও দুর্বৃত্তায়ন কেবল সাধারণ মানুষের অধিকারই হরণ করছে না, বরং একটি গোটা প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
পরিশেষে বলা প্রয়োজন, ভয়ভীতি আর লাঠি দিয়ে সাময়িকভাবে সত্যের কণ্ঠরোধ করা সম্ভব হলেও গণমানুষের ক্ষোভকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। তথাকথিত এই ‘পবিত্র’ রাজনীতির আবরণে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির কুৎসিত চেহারাটি আজ সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্ট। জনস্বার্থে এবং একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা আজ সত্যকে পিষ্ট করতে চাইছেন, ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের কলমের শক্তি ও ন্যায়ের লড়াইয়ের কাছে শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের অপশক্তিকে হার মানতেই হয়।



















