শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি:
আমি প্যাকেটটি না খুলে আমার মেয়ে নিজে খুললে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। শিশুদের খাবারে এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।শ্রীমঙ্গলের কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীতি শুক্ল বৈদ্যের বাবা কার্তিক বৈদ্য এ কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, বৃহস্পতিবার মেয়েকে দেওয়া বনরুটির ভেতর দুটি লম্বা সুই পাওয়া গেছে। এর দুই দিন আগে একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বনরুটির ভেতর ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেছিল।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে চালু করা ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির খাবার নিয়ে এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসূচির খাবার রুটিন অনুযায়ী সরবরাহ না করা, কোনো কোনো দিন নির্দিষ্ট আইটেম না দেওয়া, ভাঙা ডিম ও কাঁচা কলা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও পৌরসভার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের বনরুটি, সেদ্ধ ডিম, দুধ, বিস্কুট ও কলাসহ পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা।
বৃহস্পতিবার রাজঘাট ইউনিয়নের কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীতি শুক্ল বৈদ্য স্কুল থেকে পাওয়া বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যায়। ছোট বোনের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার জন্য প্যাকেটটি খোলার পর রুটির মাঝ বরাবর দুটি লম্বা সুই দেখতে পাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
প্রীতির বাবা কার্তিক বৈদ্য বলেন, কয়েক দিন আগে পাশের টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের ঘটনা জানার পর তিনি সন্তানদের রুটি পরীক্ষা করে খেতে বলেছিলেন। বৃহস্পতিবার মেয়ে বনরুটি নিয়ে বাড়িতে এলে তিনি নিজেই প্যাকেট খুলে রুটির ভেতরে গেঁথে থাকা একটি পুরোনো ও একটি কিছুটা নতুন সুই দেখতে পান।
কার্তিক বৈদ্য বলেন, ‘আমি প্যাকেটটি না খুলে আমার মেয়ে নিজে খুললে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। শিশুদের খাবারে এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
পরিবারের দাবি, বিষয়টি দেখতে পেয়ে তারা স্থানীয় ইউপি সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা ও প্রতিবেশীদের জানান। পরে ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজন ওই বনরুটি বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করেন।
স্থানীয় চা শ্রমিক রবি বোনার্জি বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। প্যাকেট খোলার পর রুটির মধ্যে দুটি সুই দেখতে পান। পরে তাঁরা বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানান।
শিক্ষার্থীর মা শোভা শুক্ল বৈদ্য বলেন, ‘শিশুদের খাবারে মরণঘাতী সুই পাওয়ার পর আমরা খুবই শঙ্কিত। আমার মেয়ে না দেখে সেটি খেয়ে ফেললে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। যারা শিশুদের খাবারে এমন মরণঘাতী বস্তু দিয়ে ক্ষতি করতে চায়, আমরা তাদের উপযুক্ত বিচার চাই।’
রাজঘাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা বলেন, ‘শিশুদের খাবারে এসব মরণঘাতী উপাদান পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি স্কুলে গিয়ে জানিয়েছি। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বলেছি, বিষয়টি যেন ইউএনও স্যারকে জানানো হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুরেন্দ্র তাঁতী বলেন, বৃহস্পতিবার এক অভিভাবক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বনরুটিটি বিদ্যালয়ে এনে দেখান। রুটির মাঝ বরাবর দুটি সুই ছিল বলে তাঁরা জানান। পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব ছুটিতে রয়েছেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছেন।
এর আগে গত সোমবার একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বনরুটির ভেতর ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ তোলে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমন। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধন বুনার্জি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের প্রতিনিধিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি আহমেদ বাবু বলেন, কেজুরিছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটির অভিযোগের বিষয়ে এখনো তাঁদের কেউ জানায়নি। টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে তাঁরা কোনো সত্যতা পাননি।
রুটিন অনুযায়ী খাবার না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আহমেদ বাবু বলেন, ‘এ বিষয়টি শিক্ষা অফিস জানে। আমরা কোনো আইটেম বন্ধ করলে বা কোনো আইটেম বাদ পড়লে শিক্ষা অফিসকে জানিয়ে রাখি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কেজুরিছড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁকে বৃহস্পতিবার সুই পাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। ঘটনাটি ইউএনও ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে। লিখিতভাবেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে। টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি আপনার মাধ্যমে জেনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
খাবারে বিপজ্জনক বস্তু পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় সমালোচনা ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কোমলমতি শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কঠোর তদারকির দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।















