সোহানুর রহমান, রাজনগর, মৌলভীবাজার:
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে শীতের এই মৌসুমে মৌলভীবাজারের ৫নং রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি ত্রাণ বিতরণে যে নজিরবিহীন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনগর ইউনিয়নে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। সরকারি এই ত্রাণ পাওয়ার কথা প্রকৃত দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের, অথচ বর্তমানে সেখানে ত্রাণ পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়। অভিযোগ উঠেছে যে, ৫নং রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী এবং তাঁর অনুসারী প্রভাবশালী মহল সাধারণ মানুষের হক ছিনিয়ে নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, যারা গত নির্বাচনে বর্তমান চেয়ারম্যানের পক্ষে কাজ করেছেন বা তাকে ভোট দিয়েছেন, কেবল তারাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কম্বল ও শীতবস্ত্র পাচ্ছেন। অন্যদিকে, যে সমস্ত মানুষ কোনো রাজনৈতিক বলয়ে নেই বা ভিন্ন মতাবলম্বী, তারা এই কনকনে শীতেও কোনো সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। এই দুর্নীতির পেছনে সরাসরি সম্পৃক্ত হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা সেলিম আহমেদ, খোকন মিয়া, লিপন আহমেদ, মাসুদ চৌধুরী এবং রুশন সহ আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতার নাম। ত্রাণ না পেয়ে বর্তমানে ইউনিয়নের বহু অসহায় বৃদ্ধ ও শিশু ঠান্ডাজনিত রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তারা বারবার ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও খালি হাতে ফিরে এসেছেন। চেয়ারম্যান এবং তাঁর অনুসারীরা প্রকাশ্যেই বলছেন যে, যারা ‘নৌকা’ বা ‘চেয়ারম্যানের’ লোক নয়, তাদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।
সরকারি সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা রাষ্ট্রের আমানত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে দরিদ্র মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া কেবল অনৈতিকই নয়, বরং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজনগর ইউনিয়নে যা ঘটছে, তা মূলত এক ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। তৃণমূল পর্যায়ের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আস্থার চরম সংকট তৈরি হবে এবং শীতের তীব্রতায় আরও অনেক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। আমরা আশা করি, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদের এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে দ্রুত তদন্ত শুরু করবেন এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনবেন।



















