স্টাফ রিপোর্টার:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার এক কৃষকের কমলা বাগান উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, সরকারি বনভূমি দখল এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে দেশব্যাপি ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অভিযোগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অসঙ্গতি উঠে এসেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কৃষক আলীম উল্লাহ প্রায় আট বছর ধরে সংরক্ষিত বন বিভাগের প্রায় পাঁচ একর জমিতে কমলার বাগান করে আসছিলেন। তবে ওই জমি ব্যবহারের পক্ষে তার কাছে বৈধ লিজ, বন্দোবস্ত বা সরকারি অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি।
এদিকে গত ১৬ জুলাই কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। এর পরই কৃষক আলীম উল্লাহ অভিযোগ তোলেন বন বিভাগের লোক তার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। সেই অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় প্রায় ১২’শ ফলন্ত কমলা গাছ কেটে ফেলা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সরকারি জমি দখল করে বছরের পর বছর ভোগ করে আসছেন আলিম উল্লাহ পরিবার। এদিকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ একেক জন একেক রকম বলছেন। এ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কমলা চাষি আলিম উল্লাহ বলেন, কমলা গাছ কেটে নেয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার কাছাকাছি। এদিকে তার পিতা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৫/৩০ লক্ষ টাকা। তার বোন জামাই ওয়াসিম মিয়া জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫০ লক্ষ টাকা। তবে আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলেন ভিন্ন কিছু। তিনি বলেন, এই কমলা গাছ রোপণ থেকে শুরু করে সবকিছুর হিসাব তার কাছে। সালমা বেগম বলেন, “আমার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন শিক্ষিত না, আমি পড়াশোনা করেছি তাই আমিই সব হিসাব রেখেছি। এখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৫/১৬ লক্ষ টাকা”।
আবার আলিম উল্লাহর পিতা মহিবুল্লাহ বলেন, এই বছর নিয়ে ৩ বার কমলা গাছে ফল এসেছে। প্রথম বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার, দ্বিতীয় বছর ৪ থেকে সাড়ে ৪ লক্ষ টাকার বিক্রি করেছি। এবার আনুমানিক ৫ লক্ষ টাকার কমলা বিক্রি হতো। গাছের সংখ্যা নিয়েও পরিবারের একেকজন একেক কথা বলছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, ২৫০/২৭০টি কমলা ও মালটা গাছ ছিল। এমনকি একটা টিন শেডের ঘর। বন কেটে করা হয় বড় একটা পুকুরও। সেখানে মাছ চাষ করে আসছিলেন বলে স্বীকার করেন আলীম উল্লাহর বোন জামাই ওয়াসিম মিয়া।
এদিকে আলিম উল্লাহ পরিবারের অভিযোগ, চাঁদা না দেয়ায় বন বিভাগ গাছ কেটেছে। কত টাকা চাঁদা চেয়েছে জানতে চাইলে এ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কেননা, আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলছেন, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা না নেয়ায় আমাদের বাগান কেটে ফেলেছে তারা।
সালমা বেগম বলেন, ”বন বিভাগের অর্জুন ও প্রীতম আমাদের বাড়িতে রাতে লোক পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করে। এসময় আমার স্বামী তাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। আমরা দেব না বলে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমার শ্বশুরকে বন্দুকের গোঁড়া দিয়ে পেছনে মারে।”
এদিকে আলিম উল্লাহ জানান, তার কাছে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেয়ায় গাছ কেটে ফেলা হয়। আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ৮ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছি। আগে এতো বেশি টাকা দেয়া লাগতো না তবে গত ৩ বছর ধরে প্রীতম বেশি জ্বালাচ্ছে। যেকোনো সময় টাকা দাবি করে বাড়িতে লোক পাঠায়।
আবার আলিম উল্লাহর পিতা জানান, তারা আগে থেকেই বন বিভাগকে টাকা দিয়ে আসছেন।
প্রথমে ৫০ হাজার টাকা বছরে, পরে ২০ হাজার করে, তারপর ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। তিনি জানান, উনার ভাগিনা সালামের মাধ্যমে বন বিভাগকে দিয়েছেন ১৫ হাজার, লাল হেডম্যানের ছেলের মাধ্যমে দিয়েছেন ৫০ হাজার এবং বাকি ২০ হাজার কার মাধ্যমে দিয়েছেন সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী টাকাগুলো গিয়েছে আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের কাছে।
আলিম উল্লাহর স্ত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী প্রীতম বড়ুয়া ৩ বছর ধরে টাকা আদায় করেছেন দাবি করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জে প্রীতম বড়ুয়া সহকারী বন রক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন ৭ মাস পূর্বে।
তবে আলিম উল্লাহ বড় অভিযোগ এনেছেন আদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “গাছগুলা কেটে ফেলার সময় আমি চেয়ারম্যানকে ফোন করলে চেয়ারম্যান আমাকে বলেন, ‘গাছ কাটতেছে, ঘর তো আর কাটেনাই’ বলেই ফোন কেটে দেন। বাগান কাটার পেছনে চেয়ারম্যানেরও হাত আছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে প্রত্যয়নপত্র নেন তারা। সেটার মাধ্যমেই ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও-র কাছ থেকে লোন নিয়েছেন। কিছু লোন শেষ এবং কিছু লোন এখনও চলমান। তবে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা ৬ হাজার গাছ নিয়ে।
আলীম উল্লাহ পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী তারা গাছ রোপণ করেন ১ হাজার থেকে ১৫শ; সেখানে ২০২২ সালের ২৪ মে আদমপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদাল হোসেনের স্বাক্ষরিত লোনের জন্য প্রত্যয়নপত্রে ৬ হাজার গাছ উল্লেখ করে কেন দিয়েছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।
ফলে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, ঠিক কত টাকা তারা লোন নিয়েছে পরিবারটি, কেননা আলীম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম জানান, প্রতিটি চারা গাছের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।
অসংগতি ও ধোঁয়াশার মধ্যে এদিকে আবার গুরুতর এক অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, তাকে প্রথমে দখলের পক্ষে সংবাদ করার জন্য ১০ হাজার টাকার অফার দিলে তিনি নাকচ করেন। পরে ওয়াসিদ আহমদ নামক আদমপুর ইউনিয়ন যুবদল আহ্বায়ক সাংবাদিক ম্যানেজ করে দেন আলীম পরিবারকে। ওয়াসিদ আহমদ জানান, “এমপি মহোদয়ের নির্দেশে আমি সেখানে গিয়েছি এবং তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি প্রেসক্লাবে যেতে।
আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের বিরুদ্ধে টাকা নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন রক্ষক প্রীতম বড়ুয়া বলেন, “আমি এখানে এসেছি মাত্র ৭ মাস হয়েছে। ৭ মাসে আমি ৬ টি দখল উচ্ছেদ করে সরকারকে সহযোগিতা করি এবং ৯ লক্ষ টাকার রাজস্ব উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দেই। তাছাড়া বন বিভাগের আইন অনুযায়ী আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করি। প্রায় ২-৩ মাস আগে তাদেরকে নোটিশ দিয়েছি মৌখিকভাবে। চাঁদা দাবির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের কাজে বাধা দেয়ার জন্য এবং আমরা যাতে আমাদের কাজ সফলভাবে করতে না পারি সেজন্য উদ্দেশপ্রণোদিতভাবে আমাদের নামে মিথ্যা অপ্রপচার চালানো হচ্ছে।



















